ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত ভাত দেবে না, বাবার মুখে কথাটি শুনে একসময় বিরক্তই হতেন শাহরিয়ার নাফীস। জাতীয় দলের অধিনায়ক হওয়ার পরও কেন তাকে পড়াশোনার দিকে এতটা মনোযোগ দিতে বলা হচ্ছে, সেটিও বুঝতেন না বাংলাদেশের সাবেক এই ক্রিকেটার। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই উপলব্ধি। এখন তিনি বুঝতে পারছেন, ক্রিকেটের পাশাপাশি পড়াশোনার গুরুত্ব নিয়ে বাবার সেই সতর্কবার্তা কতটা বাস্তব ছিল।
খেলাধুলা ও পড়াশোনার মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই এবার বই লিখেছেন নাফীস। শনিবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তার লেখা ‘প্লে অ্যান্ড স্টাডি, উইন দ্য রেস’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইটির সহলেখক এইচ এম আতিফ ওয়াফিক।
বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে নিজের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে নাফীস জানান, ক্রিকেট খেললেও পড়াশোনার বিষয়ে তার পরিবার কখনো ছাড় দেয়নি। নাফীস বলেন, ‘আমি যখন একদম ছোট, বাসায় আব্বা-আম্মু প্রচণ্ড চাপ দিতেন। অনেক সময় স্যাররা বলতেন, “তুই ক্রিকেট খেলে কী করবি, সারাদিন পড়াশোনা কর।” বাসায়ও সব সময় এই চাপটা ছিল।
জাতীয় দলের অধিনায়ক হওয়ার পরও একই কথা শুনতে হতো তাকে। নাফীস বলেন, ‘আমি যখন জাতীয় দলের ক্যাপ্টেনও হয়েছিলাম, তখনো আমার আব্বার কথা কানে ভাসত। আব্বা একটা কথা বলতেন, “ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত ভাত দেবে না।” তখন খুব বিরক্ত লাগত। আমি জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন্সি করছি, আর আব্বা বলছে ক্রিকেট ভাত দেবে না! কিন্তু ওই কথার মর্মটা আমি এখন বুঝি।
সেই উপলব্ধি থেকেই পড়াশোনা ও খেলাধুলার সমন্বয় নিয়ে বইটি লিখেছেন নাফীস ও আতিফ। প্রায় চার বছর ধরে তথ্য সংগ্রহের পর প্রকাশিত বইটিতে ৩৫ জন অ্যাথলেটের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন, যারা সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হয়েও শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেননি। তবে পড়াশোনা তাদের জীবনের বিকল্প পথ তৈরি করে দিয়েছে।
নাফীস বলেন, ‘আমাদের বইয়ের মূল ভাবনা ছিল এমন কিছু মানুষের গল্প তুলে ধরা, যারা অনেক প্রমিজিং ক্রিকেটার বা স্পোর্টস পারসন ছিলেন, কিন্তু খেলাটায় শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ জায়গায় যেতে পারেননি। তাদের জীবনে পড়াশোনা কতটা কাজে এসেছে, সেটাই তারা সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছেন।
বইটি তৈরির জন্য দেশ-বিদেশের ক্রীড়াবিদ, কোচ ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গেও কথা বলেছেন দুই লেখক। দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক পেসার অ্যালান ডোনাল্ড, বিশ্বকাপজয়ী কোচ স্টুয়ার্ট লসহ বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তিত্বের অভিজ্ঞতা স্থান পেয়েছে বইটিতে। নাফীসের মতে, পড়াশোনা মানেই বড় কোনো ডিগ্রি অর্জন নয়। বরং এটি মানুষের চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়। ‘পিএইচডি হোল্ডার হতে হবে, এমন নয়। কিন্তু পড়াশোনা করলে আপনি সহজভাবে চিন্তা করতে পারেন,’ বলেন তিনি।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনাকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে নাফীস। তার মতে, দেশের ক্রীড়া ও বিনোদন খাত এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যেখানে ক্যারিয়ার হিসেবে শুধু খেলাধুলার ওপর নির্ভর করেই সবাই নিশ্চিন্ত থাকতে পারে।
নাফীস বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে বাস করি, বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হবে। এখানে খেলাধুলা বলেন, নাটক-অভিনয় বলেন এই সেক্টরগুলো এখনো এত বড় ইন্ডাস্ট্রি হয়ে ওঠেনি যে পরে আপনার কোনো ব্যাকআপ না থাকলেও চলবে। এ জন্য আমার কাছে পড়াশোনাটা খুবই জরুরি।
অভিভাবকদেরও সন্তানদের খেলাধুলার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক এই অধিনায়ক। তবে একই সঙ্গে তরুণ খেলোয়াড়দের পড়াশোনার প্রতিও মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ তার। ‘আমি বাচ্চাদের বাবা-মাকে বলি, আপনার বাচ্চাকে খেলতে দিন। কিন্তু বাচ্চাদের আবার বলি, তুমি যতই খেলো না কেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি পড়াশোনা না করো, তোমার জীবন কঠিন হবে,’ বলেন নাফীস।
বাবা-মায়ের সঙ্গে ক্রিকেট ও পড়াশোনা নিয়ে সব সময় এক ধরনের সমঝোতা ছিল নাফীসের। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা-মার সঙ্গে সব সময় একটা বার্গেইন ছিল। তারা বলতেন, পড়াশোনা ও রেজাল্ট ভালো না হলে খেলতে দেবেন না। আর আমার ছিল, আমাকে খেলতেই হবে, তাই কিছুটা হলেও পড়াশোনা করতে হবে। এই সমঝোতাটা সব সময় ছিল।
তার মতে, পড়াশোনা ও খেলাধুলা একজন মানুষের বিকাশের জন্য প্রয়োজন। তাই একটিকে বেছে নিয়ে অন্যটিকে বাদ দেওয়ার বদলে দুটির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ‘সবাই বলে পড়তে হবে, পড়তে হবে। আবার শিক্ষকরা বলেন খেলতে হবে। আসলে দুটোই প্রয়োজন। বাবা-মাকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে বাচ্চাদের খেলতে দেওয়ার জন্য। আবার খেলোয়াড়দেরও বলতে হবে, পড়াশোনা করলে পারফরম্যান্সও উন্নত হবে। পড়াশোনা মানেই মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস বা ডক্টরেট ডিগ্রি নয়, আপনার পড়ার অভ্যাস থাকতে হবে, বলেন নাফীস।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।