দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের ‘ভূতুড়ে বিল’ নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। মাসজুড়ে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও অনেক গ্রাহক কয়েক গুণ বেশি বিল পাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন। কেউ কেউ আগের মাসের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিন গুণ পর্যন্ত বিল হাতে পাওয়ার কথা জানাচ্ছেন। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মিটার রিডিং না নিয়েই অনুমানভিত্তিক বিল তৈরি করা হচ্ছে। আবার কোথাও মিটার রিডিং সংগ্রহে অসাবধানতা, তথ্য এন্ট্রিতে ভুল কিংবা বিলিং সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণেও অস্বাভাবিক বিল আসছে। এসব ভুলের দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের।
গ্রাহকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভুল বিল সংশোধনের জন্য বিদ্যুৎ অফিসে একাধিকবার যেতে হলেও দ্রুত সমাধান পাওয়া যায় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো, আবেদন জমা দেওয়া এবং বারবার অনুসরণ করার পরও অনেক ক্ষেত্রে সংশোধিত বিল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ফলে একদিকে হয়রানি, অন্যদিকে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের চাপ—দুই সংকটেই পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেকেই মাসিক বাজেট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকির ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। শুধু স্মার্ট মিটার স্থাপন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন নিয়মিত মিটার যাচাই, তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা।
তাদের মতে, প্রতিটি বিলের সঙ্গে গ্রাহকের প্রকৃত ইউনিট ব্যবহারের তথ্য সহজে যাচাই করার সুযোগ থাকা উচিত। পাশাপাশি অনলাইনে অভিযোগ জানানো, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং ভুল প্রমাণিত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিল সংশোধনের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ একটি মৌলিক সেবা। তাই এ খাতে যেকোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা সরাসরি জনগণের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। ভুল বিলের কারণে যদি একজন গ্রাহক অযৌক্তিক অর্থ পরিশোধে বাধ্য হন, তবে সেটি শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, সেবার মান নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে বিলিং প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করা এবং যেখানে অনিয়ম পাওয়া যাবে, সেখানে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে গ্রাহকদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
জনসেবামূলক একটি খাত হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নির্ভুল বিলিং নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ‘ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল’ শুধু গ্রাহকের আর্থিক দুর্ভোগই বাড়াবে না, বরং জনআস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকিও আরও বাড়াবে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।