যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ভেঙে পড়েছে। ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলে রাতভর রেকর্ডসংখ্যক ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। অন্যদিকে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারেও আবার হামলা শুরু করেছে ইউক্রেন। ট্রাম্পের সতর্কতা ও যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগের মধ্যেই দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। খবর দ্যা গার্ডিয়ানের।
রাশিয়ার অভিযোগ, ইউক্রেনের রিয়াজান অঞ্চলে একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালানো হয়েছে। ট্রাম্প আকস্মিকভাবে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার পর এটিই ওই অঞ্চলে প্রথম হামলা বলে দাবি করেছে মস্কো। তবে রাশিয়া ও ইউক্রেন—কোনো পক্ষই এমন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কথা স্বীকার করেনি।
ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, এসব হামলার কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেল জ্বালানির দাম বেড়েছে।
তবে বুধবার (১৪ অক্টোবর) জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা আবার শুরু করবে ইউক্রেন। শান্তি আলোচনায় কিয়েভ যে প্রস্তুত, তা দেখাতে সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ রাখা হয়েছিল। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে তিনি বলেন, ‘শোধনাগারে হামলার ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে। আমরা শেষ করেছি।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে ঘাটতির সমালোচনা করে জেলেনস্কি একে ‘বিপজ্জনক’ বলে উল্লেখ করেন।
রিয়াজানের তেল শোধনাগারে আগুন জ্বলতে থাকার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দাবি, স্থাপনাটিতে ৬৯টি ড্রোন ও চারটি ‘ফ্লেমিঙ্গো’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। তবে রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুলিতে ভূপাতিত একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ শোধনাগারে পড়ে আগুনের সূত্রপাত হয়।
এদিকে ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলীয় কিরোভোহরাদ অঞ্চলে ৩৬০টির বেশি রুশ ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। রাশিয়ার কাছাকাছি অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এ এলাকায় আগে হামলার তীব্রতা কম ছিল। তবে এবারের হামলায় তিনজন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন।
অঞ্চলটির গভর্নর আন্দ্রি রাইকোভিচ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘শত্রুপক্ষ পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, পরিবহন প্রতিষ্ঠান, সরবরাহব্যবস্থা এবং আবাসিক ভবনে আঘাত হেনেছে।
জেলেনস্কির দাবি, রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর ৮৫০টির বেশি ‘শাহেদ’ ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এমন সময়ে এসব হামলা হচ্ছে, যখন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহারের সক্ষমতা কৃত্রিমভাবে সীমিত করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড স্যাটেলাইট ইন্টারনেট টার্মিনাল ব্যবহারে আকস্মিক বিধিনিষেধের বিষয়টিও তিনি ইঙ্গিত করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সুযোগ পাওয়ার পর এবং ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা দেখে রাশিয়া যে ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা বাড়িয়েছে, তা স্পষ্ট।
তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেনের ধারাবাহিক সমর্থন প্রয়োজন, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে। এই যুদ্ধ নিয়ে আমাদের অংশীদারদের কাছ থেকে সততা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সবার উচিত আগ্রাসীর পক্ষে না দাঁড়িয়ে মানুষের জীবন রক্ষা, যুদ্ধের অবসান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার পাশে থাকা।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আকস্মিকভাবে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করেন। তিনি লেখেন, ‘অবিলম্বে কার্যকর হচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধে জ্বালানি যুদ্ধবিরতি। উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। এটি ভঙ্গ করবে না!
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পরও রাশিয়া ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা অব্যাহত রাখে। হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এতে রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ ব্যাহত হয়। এর মধ্যে শান্তি আলোচনায় নিজেদের প্রস্তুতি দেখাতে ইউক্রেন সাময়িকভাবে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
কিন্তু হোয়াইট হাউস জেলেনস্কির ওপর চাপ বাড়ায়। রাশিয়ার শর্ত মেনে নিতে তাকে চাপ দেওয়ার অংশ হিসেবে ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহের কর্মসূচি বন্ধ এবং যুদ্ধক্ষেত্রসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র এসব হুমকির কিছু বাস্তবায়ন করেছে বলেও মনে হচ্ছে। ইউক্রেনের দাবি, চলতি সপ্তাহের কয়েক দিন রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আগাম সতর্কবার্তা পায়নি কিয়েভ। বুধবার ইউক্রেনীয় সেনারাও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন স্টারশিল্ড সেবা ব্যবহারে তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এতে সম্মুখসারিতে ড্রোন পরিচালনার বিভিন্ন অভিযান ব্যাহত হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বিনিময়ে দেশটির নেতৃত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকা উচিত বলে মনে করেন ট্রাম্প। তিনি এমনও বলেছেন, ইউক্রেনের ‘নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়া উচিত’।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কিকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি নিজেকে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার মনে করছেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ। তার কথায়, ‘দুঃখজনক যে আমরা একজন শক্তিশালী অংশীদারকে হারাচ্ছি।
এদিকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত স্টারলিংক টার্মিনাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্কও জেলেনস্কির কড়া সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার মাস্ক স্টারলিংক ব্যবস্থা সীমিত করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এগুলো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে রাশিয়ার পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবে—জেলেনস্কির এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাস্ক লেখেন, ‘এভাবে হত্যাযজ্ঞ চলতেই থাকবে… জেলেনস্কির বিদায় নেওয়ার সময় হয়েছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।