কুমিল্লার আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার আসামি অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে ফের গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
শনিবার (৮ আগস্ট) ভোরে ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু ইউসুফ।
তিনি জানান, আদালতের আদেশ প্রতিপালন না করায় এবং একই আদেশে পুলিশের প্রতি তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ থাকায় হাফিজুর রহমানকে ফের গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এবং আসামির পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে কুমিল্লার আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
এর আগে গত ২২ এপ্রিল তনু হত্যা মামলায় হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করে পিবিআই। পরে তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে গত ৪ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। তবে ৬ আগস্ট হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করেন আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত। একই সঙ্গে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয় পুলিশকে। সেই আদেশের পরই তাকে ফের গ্রেফতার করা হলো।
যেভাবে হত্যা করা হয় তনুকে
সোহাগী জাহান তনু ছিলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করাতে যান তিনি। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি।
রাতে স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলে কুমিল্লা সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছাকাছি একটি জঙ্গলে তনুর মরদেহ পাওয়া যায়। তার মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
তদন্তে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল বলে নিশ্চিত হয় সিআইডি। তার পোশাক থেকে তিন অজ্ঞাত ব্যক্তির শুক্রাণুর নমুনা পাওয়ার কথা তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন। পরে ২০২৬ সালের মে মাসে তনুর পোশাকে আরও একজন ব্যক্তির রক্তের নমুনা পাওয়ার তথ্যও সামনে আসে। ফলে তার পোশাকের নমুনায় মোট চার ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার আলামত পাওয়ার কথা জানায় তদন্ত সংস্থা।
১০ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত
তনু হত্যার পর প্রথমে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করে। পরে তদন্তের দায়িত্ব যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডির কাছে। ২০২০ সালের অক্টোবরে মামলার নথি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে পিবিআই মামলাটির তদন্ত করছে।
দীর্ঘ এই সময়ে মামলায় একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে আদালত সূত্র জানায়, মামলায় ৭৯টি শুনানির তারিখ পার হলেও তখন পর্যন্ত কোনো গ্রেফতার বা বিচার শুরু হয়নি। এরপর ২২ এপ্রিল অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১০ বছর পর প্রথম গ্রেফতার হয়।
মামলার সর্বশেষ অবস্থা
মামলাটিতে এখন ডিএনএ আলামতকে কেন্দ্র করে তদন্ত এগোচ্ছে। হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্তকারীরা তার নমুনাসহ সন্দেহভাজন কয়েকজন সাবেক সেনাসদস্যের ডিএনএ তনুর পোশাক থেকে পাওয়া আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।
এ ছাড়া গত ১৬ জুলাই কুমিল্লার একটি আদালত আরও দুই ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার অনুমতি দেন। তাদের নমুনা তনুর পোশাক থেকে পাওয়া অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
এর আগে জুনে তনু হত্যা মামলায় সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে এখনো এ মামলায় বিচার শুরু হয়নি। দীর্ঘ ১০ বছর পর একাধিক সন্দেহভাজনকে ঘিরে তদন্ত এবং ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়ায় মামলাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তনুর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার দাবি করে আসছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।