কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে এক রাতে জেলার ১৮ থানায় ৬২৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের মধ্যে ৪৫১ জনকে অভিভাবকদের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অপর ১৭৩ জনকে মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, মোবাইল কোর্ট, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার আদালতে পাঠানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জেলা পুলিশের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ জানায়, সম্প্রতি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উঠতি বয়সী কিশোরদের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। গত শুক্রবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে এ অভিযানকে পুলিশের বড় ধরনের অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার সন্ধ্যা থেকে জেলার ১৮টি থানা এলাকায় একযোগে অভিযান শুরু করে পুলিশ। অভিযান শুরুর পর বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন থানার সামনে আটক কিশোরদের স্বজন ও অভিভাবকদের ভিড় দেখা যায়।
দাউদকান্দিতে আটক ৫৯ জনই মুক্ত
দাউদকান্দি মডেল থানা ও গৌরীপুর পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৯ জনকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে বুধবার রাত আটটার দিকে থানার সামনে শতাধিক অভিভাবক জড়ো হন। এ সময় পুলিশের বিরুদ্ধে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে থানার একটি কক্ষে থাকা অন্তত ১৫ জন কিশোর দরজা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে যায়।
সন্ধ্যায় দাউদকান্দি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান পলাশ বলেন, থানায় বড় ধরনের কোনো ভাঙচুর হয়নি। থানার বাইরে হয়তো স্লোগান দেওয়া হয়েছে। একটি দরজার কিছু অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। রাতে কয়েকজন কিশোর থানার বাইরে চলে গেলেও তাদের অভিভাবকেরা পরে তাদের আবার থানায় নিয়ে আসেন।
ওসি বলেন, দিনভর যাচাই-বাছাই করে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ না পাওয়ায় ৫৯ জনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সন্তানদের ছাড়াতে থানায় অভিভাবকদের ভিড়
বৃহস্পতিবার দুপুরে কুমিল্লা নগরের কোতোয়ালি মডেল থানার সামনে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সনদ এবং কলেজের কাগজপত্র নিয়ে অপেক্ষা করছেন এক নারী। তিনি বলেন, পুলিশ জানিয়েছে— তার ছেলে শিক্ষার্থী এটি প্রমাণ করতে পারলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
ওই নারী জানান, বুধবার রাতে থানার পাশের পানপট্টি এলাকা থেকে তার ছেলেকে আটক করে পুলিশ। তিনি বলেন, আমার ছেলে রাত নয়টার দিকে এলাকার ছেলেদের সঙ্গে বসে আড্ডা দেয়। তাকে ধরে নিয়ে আসা সঠিক কাজ করেছে পুলিশ।
আরেক অভিভাবক জানান, অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া তার ভাগনেকে সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে আসে। তাকে ছাড়িয়ে নিতে পরিবারের সদস্যদের থানায় আসতে হয়েছে। এতে তারা বিব্রত ও লজ্জিত বোধ করছেন বলেও জানান তিনি।
নগরের ঢুলিপাড়া এলাকা থেকে আটক এক কিশোর রংমিস্ত্রির মা ছেলেকে ছাড়াতে থানায় আসেন। তিনি বলেন, রাতে ঢুলিপাড়ার একটি ভাঙা ভবনে কয়েকজন কিশোর আড্ডা দিচ্ছিল। এলাকার বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশে তার ছেলেও খারাপ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
থানার সিঁড়িতে বসে কাঁদছিলেন এক বৃদ্ধা। তিনি বলেন, তার ছেলের বয়স ৩৫ বছর। বুধবার রাতে আমিরদিঘীর পাড় এলাকা থেকে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে আসে। ‘আমার ছেলের কী দোষ, জানি না। পুলিশ বলছে, তাকে ছাড়বে না’ বলেন তিনি।
নগরের মডার্ণ স্কুলের নবম শ্রেণির এক ছাত্রকেও ধর্মসাগর পাড় থেকে আটক করা হয়। তাকে ছাড়াতে তার মা স্কুলের কাগজপত্র নিয়ে সকাল থেকে থানায় অপেক্ষা করেন। তিনি বলেন, প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার কথা বলে তার ছেলে বাসা থেকে বের হয়েছিল। রাত ১০টার দিকে জানতে পারেন, সে থানায় রয়েছে।
বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার দিনভর সন্তানদের ছাড়াতে বিভিন্ন বয়সী অভিভাবকদের কোতোয়ালি থানার সামনে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কেউ কেউ নাগরিক সনদ, শিক্ষাগত সনদসহ বিভিন্ন কাগজপত্র নিয়ে ছুটোছুটি করেন।
অভিভাবকেরা পুলিশের এ ধরনের অভিযানে সন্তোষ প্রকাশ করলেও তাদের দাবি, যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনো নির্দোষ কিশোর বা শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার না হয়।
কোতোয়ালি থানায় আটক ৭৫, ব্যবস্থা ৫২ জনের বিরুদ্ধে
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার সমকালকে বলেন, কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে এ থানায় মোট ৭৫ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে ৫২ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপর ২৩ জন শিক্ষার্থী। তাদের অধিকাংশই অভিভাবকের অবাধ্য হয়ে আড্ডায় জড়ানো কিশোর। তাদের অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা নেওয়ার পর হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান ওসি।
পুলিশ বলছে, কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা ঠেকাতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।