সকল মেনু

সবশেষ

ইরানের হুঁশিয়ারি

যুদ্ধের আগুনে পুড়ে ছাই হবে সবাই

ভিটিভি বিডি ডেক্স

ভিটিভি বিডি ডেক্স

প্রকাশ : আগস্ট ১, ২০২৬
পড়তে: মিনিট
ফন্ট সাইজ:
0Shares

ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার হুমকির প্রতিক্রিয়ায় কঠোর প্রতিশোধের ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। এদিকে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক হামলা চলছেই। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

 

ইরানের যুদ্ধকালীন সামরিক কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল আলি আবদুল্লাহি শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গোটা অঞ্চলজুড়ে বড় আকারের যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।’ আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে এসব দেশের রাজধানী, সম্পদ ও অবকাঠামোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে তারা ইসরাইলের যুদ্ধযন্ত্রকে শক্তিশালী করছে।

আবদুল্লাহি সতর্ক করে বলেন, ‘সুস্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে, মুসলিম দেশগুলোকে অবশ্যই দূরদর্শিতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধ পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং তাদের সঙ্গে সহযোগিতা ও জোটবদ্ধতার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় যে দেশই অপরাধী ও আগ্রাসী যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ঢাল হবে, সেই দেশই যুদ্ধের আগুনে পুড়বে।

 

এই সতর্কবার্তা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায়। ওই সব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল খুব শিগগিরই ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাসহ বেসামরিক অবকাঠামোয় বড় আকারের হামলা চালাতে পারে। সূত্রের বরাত দিয়ে ওই সব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এই অভিযানের চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি। অভিযানটি দুই সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে, যার লক্ষ্য হবে রাজধানী তেহরানসহ ইরানজুড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অচল করে দেয়া।

 

ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ জানিয়েছে, লাগাতার সামরিক অভিযানের কারণে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে এসেছে। বর্তমানে প্যাট্রিয়ট মজুত ১ হাজারের নিচে এবং থাড মজুত প্রায় ২৫০-এ নেমে এসেছে।

ইরানের রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাসনিম শনিবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘পাগলামির’ জবাবে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে বিস্তারিত প্রতিশোধমূলক পরিকল্পনা করে রেখেছে।

 

গত মঙ্গলবার ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেন, ‘আমরা ইরানের জ্বালানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে খুবই আগ্রহী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখনই এতে অনুমোদন দিচ্ছে না। কারণ, তাদের আশঙ্কা এতে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালাবে এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারে সংকট তৈরি হবে।’ চ্যানেল ফোরটিনের সম্প্রচার করা এক নিরাপত্তা সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ইসরাইল ইরানকে ‘৪০ বছর পিছিয়ে দিতে’ প্রস্তুত।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের সামরিক ঘাঁটি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এর পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা হয়েছে, যা পুনর্নির্মাণে বছরের পর বছর ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এই বোমাবর্ষণ ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সংকুচিত অর্থনীতি এবং বড় ধরনের জ্বালানি ঘাটতিতে নয় কোটির বেশি ইরানি চাপে রয়েছেন।

 

প্রতিক্রিয়ায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) ও ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী ওই অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া ইসরাইল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে দেশটি।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে হামলা আরও তীব্র হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোররাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অন্তত পাঁচটি প্রদেশে হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, আইআরজিসির কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, উপকূলীয় নজরদারি ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে ওই হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলায় বেশ কয়েকজন সেনাসহ একাধিক বেসামরিক মানুষ হতাহত হন। দক্ষিণাঞ্চলীয় কেশম দ্বীপে বাড়িতে হামলায় দুই বছরের এক শিশুরও মৃত্যু হয়েছে।

 

শনিবার কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশটির আকাশসীমার মধ্যে বেশ কয়েকটি ইরানি ড্রোন ধ্বংস করেছে। এতে সরকারি স্থাপনা ও বেসামরিক যানবাহনের সামান্য ক্ষতি হয়েছে। পশ্চিমা সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওমান উপকূলে অন্তত দুটি জাহাজে হামলা হয়েছে; এর মধ্যে একটির ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম শনিবার ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজের কাছাকাছি এলাকা থেকে ভিডিও প্রচার করে সতর্ক করে বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপদ চলাচলের প্রতিশ্রুতিতে ভুলবশত ভরসা করার এটাই পরিণতি।’ ইরান জানিয়েছে, তারা আরও চারটি জাহাজকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আইআরজিসির অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করতে পারবে না।

 

এদিকে ইরাকে ইরানি কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন হামলা হচ্ছে। এই গোষ্ঠীগুলো ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করতে যুদ্ধে যোগ দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। শুক্রবার দুটি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী পৃথকভাবে দাবি করেছে, তাদের ওপর হামলা হয়েছে। ইরাকে ইরানপন্থি গণমাধ্যম শনিবার ইরাকি কুর্দিস্তানের এরবিলে একটি তেল শোধনাগারে অজ্ঞাত পক্ষের হামলার পর আগুন লাগার ভিডিও প্রকাশ করেছে।

এসব হামলার কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথভাবে তেহরানপন্থি ইরাকি সশস্ত্র বাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায়। এতে অন্তত ২০ জন যোদ্ধা এবং একাধিক আইআরজিসি উপদেষ্টা নিহত হন। ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথিদের সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং বাব-এল-মান্দেব ও লোহিত সাগরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার জবাবেই ওই হামলা চালানো হয়েছিল। লোহিত সাগরের অস্থিরতা মোকাবিলায় রিয়াদ এখন একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে।

 

দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সেনাবাহিনী এখনো বিশাল এলাকা দখল করে রেখেছে এবং বিভিন্ন গ্রাম ও অবকাঠামো ধ্বংস করছে। পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বলে ধারণা করা স্থাপনাগুলোতেও বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে।

তবে কূটনীতির দুয়ার এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। ইরান জোর দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ মোকাবিলায় হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার তারা ছাড়বে না। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর শনিবার এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সামরিক হামলা এবং নৌ-অবরোধ হরমুজ প্রণালি ও অন্যান্য জলপথের পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজার ও ভোটারদের এর মূল্য চোকাতে হবে।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলার মধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে আলোচনার জন্য কোনো অনুরোধ পাঠানো হয়নি। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

 

শনিবার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আবারও ইঙ্গিত দিয়েছেন, সামরিক পদক্ষেপ থেকে অর্জিত সাফল্যকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো দরকার। কট্টরপন্থি আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা বিজয়ী হয়েছি। কিন্তু এই যুদ্ধের বিজয়কে সংহত করতে হবে; আমাদের এই বিজয়কে লিপিবদ্ধ করতে হবে।’ তিনি বলেন, দেশকে একটি সুস্পষ্ট ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদী হতে হবে। গালিবাফ আরও বলেন, ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়কে আরও বেশি স্বাধীনতা দিতে কর্তৃপক্ষের কাজ করা উচিত। তবে এ ব্যাপারে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।

শনিবার তেহরানে সপ্তাহের প্রথম দিনে কর্তৃপক্ষের বার্তা ছিল প্রতিশোধকেন্দ্রিক। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের প্রথম দিনে অন্যান্য কর্মকর্তাসহ নিহত হন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তেহরানের কেন্দ্রীয় ভালিআসর স্কয়ারে একটি বিশাল ব্যানারে লাল ফিতা বাঁধা এক কিশোরকে রক্তাক্ত প্রতিশোধের পতাকা হাতে দেখা যাচ্ছে। কট্টরপন্থি দৈনিক পত্রিকা কেহানের প্রথম পাতার শিরোনাম ছিল, ‘ইরানের অটল অবস্থানে হতাশ ট্রাম্প, তার উপদেষ্টা ও মিত্ররা।

ফন্ট সাইজ:
0Shares

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।