২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলে বিপর্যয় ঘটেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার পাশ করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী। পাশের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ শিক্ষার্থী। এবার প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিলেবাসের কারণে অনেক পরীক্ষার্থী মানসিকভাবে চাপের মুখে পড়ে। এ ছাড়া খাতা মূল্যায়নে লিবারেল না থেকে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাও বিরাজমান ছিল। এতে অনেকেই কলেজবিমুখ হয়ে পড়েন। যা এবারের ফলে স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে।
২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল আজ শনিবার প্রকাশিত হয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এ বছর গড় পাশের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অন্যদিকে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
প্রকাশিত ফলের তথ্য অনুযায়ী, এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন। তাদের মধ্যে পাশ করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। আর ফেল করেছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন।
এর মধ্যে শুধু ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ইংরেজি বিষয়ে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ফেল করেছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন।
ফেল করা পরীক্ষার্থীদের আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
এবার শুধু মোট অকৃতকার্যের সংখ্যাই বাড়েনি। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। ২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর জিপিএ-৫ কমেছে ৪২ শতাংশ। আর পাশের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
এ বছর মাদ্রাসাসহ ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এক বছরে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
আর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন বা প্রায় ৪২ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য যেমন অতিরিক্ত সময় ও পরিশ্রম দিতে হয়েছে, তেমনি এত বড় সিলেবাসের কারণে অনেকেই মানসিকভাবে চাপের মুখে পড়ে। এর ওপর গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে সব বোর্ডে অভিন্ন ও মানসম্মত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হওয়ায় ফলে তার একটা স্পষ্ট প্রভাব দেখা গেছে। পাশাপাশি, খাতা মূল্যায়নে ঢালাওভাবে বাড়তি নম্বর না দিয়ে একদম যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রেও কঠোর নজরদারি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছিল। এসব কারণেই মূলত এবার পাশের হার কিছুটা কমেছে বলে তারা মনে করছেন।
তারা আরও মনে করছেন, ফল বিপর্যয়ের পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিবেশও বড় এক ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পরই এসব শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হয়েছিল। ওই সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা চলছিল, তার প্রভাবে অনেকেই কলেজবিমুখ হয়ে পড়েন। ফলে নিয়মিত ক্লাশে উপস্থিত থাকা এবং পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের ভেতরে একধরনের অনীহা তৈরি হয় যা এবারের ফলে স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে।
ঢাকা বোর্ড পাশের হার নিম্নমুখী
ঢাকা বোর্ডে ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছেন। গত বছর ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছিলেন। এবারের এইচএসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। মোট পাশ করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। জিপিএ ফাইভ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছর এইচএসসি ও সমমানে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন পরীক্ষার্থী। গত বার এইচএসসি ও সমমানে মোট পাশের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম পাশ চট্টগ্রাম বোর্ডে
গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম পাশের হার দেখল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। পাশের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ৭ শতাংশে। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯২৯ জন। গত বছর পাশের হার ছিল ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। একই সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩ হাজার ২০১ জন।
রাজশাহী বোর্ডে পাশের হার কমেছে
এ বছর এইচএসসির পাশের হার কমে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশে নেমেছে। করোনা মহামারিতে ২০২০ সালে অটোপাশের পর এবারই পাশের হার সর্বনিম্ন। প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এ বছর বোর্ডের ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৬ জন পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৬১ হাজার ৮৯৪ জন পাশ করেছেন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন বলেন, শিক্ষার্থীরা খাতায় যেমন লিখেছে, সেভাবেই নম্বর পেয়েছে। কাউকে বাড়তি নম্বর দেওয়া হয়নি। তাই সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব পড়েছে।
বরিশালে ১১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল
প্রকাশিত ফলে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯৫০ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় এবার পাশের হার ও জিপিএ-৫ দুটিই কমেছে। এছাড়া বোর্ডের ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাশ করতে পারেননি। ফল ঘোষণা করেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা। তিনি বলেন, এবারের ফল যথাযথভাবে পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন ঘটেছে।
মানবিকে ফেল করেছে সর্বোচ্চ
১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাশের হার ৫২.১২ শতাংশ। এবার মানবিক বিভাগ থেকে ফেল করেছে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মানবিক বিভাগে ছাত্র ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩২ জন সেখানে পাশ করেছে ৯০ হাজার ৬৬৪ জন। এছাড়া ছাত্রী অংশ নিয়েছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৩ জন, সেখানে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৭ জন পাশ করেছে। সব মিলিয়ে পাশের হার ৪২.১৭ শতাংশ।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।