ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রদীপ রাওয়াত আর নেই। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে মারা যান তিনি। ৭৪ বছর বয়সী এই অভিনেতা স্ত্রী কল্যাণী ও ছেলে বিক্রমাদিত্যকে রেখে গেছেন। আজ বিকেলে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
হিন্দি, তেলুগু, তামিলসহ একাধিক ভাষার সিনেমায় অভিনয় করে নিজের জাত চিনিয়েছেন প্রদীপ। পর্দায় তার ভয়ংকর উপস্থিতি দর্শকদের মনে গেঁথে থাকলেও অনেকেই জানেন না, অভিনয়ে আসার আগে তিনি ব্যাংকে চাকরি করতেন। ভারতীয় গণমাধ্যম দৈনিক ভাস্কর-এর তথ্য অনুযায়ী, অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে প্রদীপ রাওয়াত একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। পরে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি অভিনয়ে মনোযোগ দেন।
এসএস রাজামৌলি পরিচালিত ‘সাই’ (২০০৪) সিনেমাই তাকে দক্ষিণী চলচ্চিত্রে অন্যতম জনপ্রিয় খলনায়কে পরিণত করেছিল। আর তার শেষ তেলুগু সিনেমা যেন সেই যাত্রারই এক প্রতীকী সমাপ্তি হয়ে উঠেছে। দক্ষিণী সিনেমায় জনপ্রিয় হওয়ার আগেই হিন্দি টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন প্রদীপ রাওয়াত। বি. আর. চোপড়ার কালজয়ী টিভি সিরিজ ‘মহাভারত’-এ অভিনয় করে দর্শকদের নজর কেড়েছিলেন তিনি। এরপর আশি ও নব্বইয়ের দশকে অসংখ্য হিন্দি সিনেমায় নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেন।
২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া এসএস রাজামৌলির ‘সাই’ সিনেমায় নিষ্ঠুর গ্যাংস্টার বিকশু যাদব চরিত্রে অভিনয় করে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যান প্রদীপ রাওয়াত। নীতিন ও জেনেলিয়া ডি’সুজা অভিনীত ছবিতে নাকে বড় রিং পরা তার ভয়ংকর লুক ও শক্তিশালী উপস্থিতি তেলুগু সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় খল চরিত্র হিসেবে স্থান করে নেয়।
এই সাফল্যের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এরপর প্রভাসের ‘ছত্রপতি’, চিরঞ্জীবীর ‘স্ট্যালিন’, আল্লু অর্জুনের ‘দেশামুদুরু’সহ একের পর এক সফল তেলুগু ছবিতে অভিনয় করেন। একই সময়ে সূরিয়ার তামিল ব্লকবাস্টার ‘গজিনি’ সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যায় তাকে।
দীর্ঘদিন ভয়ংকর খলনায়ক হিসেবে পরিচিত থাকলেও সময়ের সঙ্গে তার চরিত্রে আসে পরিবর্তন। এ বছরের মে মাসে মুক্তি পাওয়া তার শেষ তেলুগু সিনেমা ‘গায়াপাড্ডা সিমহাম’ সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
কাশ্যপ শ্রীনিবাস পরিচালিত সিনেমায় তার চরিত্রের নাম ছিল বিকশু দাস, যা অনেকের মতে ‘সাই’-এর বিকশু যাদব চরিত্রের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধাঞ্জলি। যদিও এবার তার নাকে আগের মতো রিং ছিল না, তবে ধুতি, গেঞ্জি ও গয়নায় সাজানো লুক দর্শকদের সেই পুরোনো চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়।
তবে চরিত্রের স্বভাব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার তিনি ছিলেন একজন তান্ত্রিক, যার মধ্যে ছিল হাস্যরসের ছোঁয়া। একই সঙ্গে তিনি একজন স্নেহশীল বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেন, যিনি চান তার ছেলে ভৈরব দাস পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখুক। এতে স্পষ্ট হয়, ভয়ংকর খলনায়ক থেকে আবেগময় চরিত্রে নিজেকে কীভাবে বদলে নিয়েছিলেন প্রদীপ রাওয়াত।
জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বিভিন্ন ভাষার সিনেমায় নিয়মিত কাজ করেছেন প্রদীপ রাওয়াত। হিন্দিতে তাকে সর্বশেষ দেখা গেছে ২০২৫ সালের ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র ‘ছাভা’-তে, যেখানে অভিনয় করেছেন ভিকি কৌশল, রাশমিকা মান্দানা ও অক্ষয় খান্নার সঙ্গে। তামিলে তার শেষ ছবি ‘ডিডি রিটার্নস’ (২০২৩), কন্নড়ে ‘চ্যাম্পিয়ন’ (২০২২) এবং মালয়ালমে ‘ওরু কাদাথু নাডান কাধা’ (২০১৯)।
এছাড়া বাংলাদেশের সিনেমায় কাজ করেছেন তিনি। অনন্ত জলিল ও আফিয়া নুসরাত বর্ষা অভিনীত ‘নেত্রী-দ্য লিডার’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন এই অভিনেতা। এজন্য কিছুদিন আগে বাংলাদেশে শুটিং করতে এসেছিলেন তিনি। যদিও সিনেমা এখনো মুক্তি পায়নি।
প্রদীপ রাওয়াতের ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপক সিদ্ধার্থ তিওয়ারি জানান, ক্যানসার থেকে একবার সুস্থ হলেও কয়েক মাস আগে রোগটি আবার ফিরে আসে। গত কয়েক মাস তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শেষ কয়েক দিনে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে ও এনডিটিভি
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।