চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরু করে। ইরানও তৎক্ষণাৎ পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে। এতে অগ্নিগর্ভে পরিণত হয় গোটা মধ্যপ্রাচ্য।
যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের বিষয়ে একাধিকবার বড় দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে প্রথম কয়েক সপ্তাহ পর ইরানের সামরিক সক্ষমতা যে গতিতে পুনর্গঠিত হয়েছে, তাতে হতবাক ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দ্রুত পুনর্গঠনের বিষয়টি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মহলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের মূল পর্ব শেষ হওয়ার পর ইরান যেভাবে তার সামরিক বাহিনী ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে, তা ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ)-এর প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি দ্রুত পুনরায় গড়ে ওঠায় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা অবাক হয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুনের শুরুতে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে ইরানের আক্রমণাত্মক তৎপরতা জোরালো হয়। জুলাইয়ের শুরুতে তা আরও তীব্র আকার নেয় এবং অঞ্চলটির কয়েকটি আরব দেশেও ইরান নতুন করে হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হস্তক্ষেপের অভিযোগও ওঠে তেহরানের বিরুদ্ধে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমটির দাবি, ইরান কীভাবে এত দ্রুত তার আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে, তা নিয়ে দেশটির শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, ইরান নিজেদের অস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনে এমন কিছু কার্যকর কৌশল বের করেছে, যা আগে ইসরায়েলি মূল্যায়নে পুরোপুরি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর সময় দেশটির হাতে আনুমানিক ১ হাজার ৩০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর সময় সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০-তে পৌঁছেছিল বলে ইসরায়েলি মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমটি আরও দাবি করেছে, কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা যে নতুন অস্ত্র উৎপাদনের গতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন, সেই বক্তব্যের সত্যতাও তারা নিশ্চিত করেছে।
শুধু ইসরায়েল নয়, একই ধরনের উদ্বেগ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহলেও। গত মে মাসে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া বক্তব্যে চার মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের গতি সম্পর্কে আগে যে সময়সীমা অনুমান করা হয়েছিল, তেহরান তা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করছেন।
এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময়কার গোয়েন্দা মূল্যায়নে ধারণা করা হয়েছিল, ইরান প্রায় ছয় মাসের মধ্যে- অর্থাৎ নভেম্বরের মধ্যে—তার ড্রোন হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই পুনর্গঠন প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে চীনের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে বলেও দাবি করেছেন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি। সিএনএনকে তারা জানিয়েছেন, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান ইরানে সরবরাহ করে আসছে চীন। তবে ইরানের বন্দরগুলোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও চাপ সেই সরবরাহে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার নিয়েও উদ্বেগ
ইরানের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত পুনর্গঠনের পাশাপাশি যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অত্যন্ত নির্ভুল ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের কাছে চলতি মাসের শুরুতে কয়েকটি সূত্র দাবি করেছিল, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার মজুত থাকা প্রায় সব এটিএসিএমএস এবং প্রেসিশন স্ট্রাইক মিসাইল ব্যবহার করে ফেলেছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে যুক্তরাষ্ট্রকে তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতির ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেলে লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য চালকবাহী যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য বিমান হামলা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
এ পরিস্থিতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তিনি যদি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় আকারের হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে আগের তুলনায় সীমিত ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের বিষয়টি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ইরানের সক্ষমতা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
ইরানের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত পুনর্গঠনের বিষয়ে উদ্বেগের মধ্যেই আইডিএফ দাবি করেছে, যুদ্ধ চলাকালে ইরানের সামরিক সক্ষমতার বিস্তৃত পরিসরে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে তারা।
জেরুজালেম পোস্টের প্রশ্নের জবাবে আইডিএফ জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় ইরানের বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতার ওপর ‘ব্যাপক ক্ষতি’ করা হয়েছে। এর ফলে যুদ্ধের আগে যে পরিমাণ ও যে গতিতে এসব সক্ষমতা পুনর্গঠন করা সম্ভব ছিল, এখন আর একই মাত্রায় তা করা সম্ভব নয় বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
আইডিএফ আরও জানিয়েছে, ইরান কীভাবে তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, তা তারা ‘ঘনিষ্ঠভাবে এবং ধারাবাহিকভাবে’ পর্যবেক্ষণ করছে। সেই অনুযায়ী তাদের পরিস্থিতি মূল্যায়নও নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে।
তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানের পুনর্গঠনের সুনির্দিষ্ট গতি বা সক্ষমতার মাত্রা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করলে আইডিএফের গোয়েন্দা উৎস ও পদ্ধতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে। আইডিএফ বলেছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের বিষয়ে পাওয়া নতুন তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের মূল্যায়ন নিয়মিত পরিবর্তন করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছে।
তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত পুনর্গঠিত হওয়ার খবর যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে ইরান যদি দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে তেহরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনও নতুন সামরিক অভিযান আগের তুলনায় আরও বড় ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
আপনার মোবাইল দিয়ে এই QR কোডটি স্ক্যান করে বিস্তারিত খবরটি অনলাইনে পড়ুন।
https://www.vtvbd.com/world/2026/08/15/newsID_917/© VTV BD | Bangla News | Latest News | প্রিন্ট/ডাউনলোড: ১৫-০৮-২০২৬, ০১:৪২ অপরাহ্ণ