দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ‘পলিসি ইন্ডিপেনডেন্স’ বা ‘নীতি স্বাধীনতা’ অপরিহার্য বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্বায়ত্তশাসন সংকুচিত হয়েছে। দেশীয় অগ্রাধিকারের পরিবর্তে বাইরের চাপের প্রভাবে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন করতে না পারলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত ‘উন্নয়ন কৌশল ও নীতিগত স্বাধীনতা: বাংলাদেশের উন্নয়ন পথপরিক্রমা’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। রাজধানীর বনানীতে পিআরআই কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন গবেষণা সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার।
ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের উন্নয়নের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশের নীতি স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ষাটের দশকে দক্ষিণ কোরিয়া যখন তাদের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা করে, তখন বিশ্বব্যাংক ‘হাস্যকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু কোরিয়া তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী ও জাপানের কাছ থেকে পাওয়া যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের টাকা ব্যবহার করে সেই প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করে। একইভাবে ভিয়েতনাম সংস্কারের জন্য বিশ্বব্যাংকের বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিল– টাকা দিয়ে সংস্কার কেনা যায় না, আমরা আমাদের মতো করেই সংস্কার করব।
ড. আনিসুজ্জামান আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে। বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব যার অন্যতম কারণ। তিনি জানান, একবার তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চেয়েছিলেন কেন স্বাস্থ্য হানিকর আইসক্রিমের ওপর কর কমানো হচ্ছে, যার উত্তরে জানানো হয়েছিল যে বাচ্চারা এটি পছন্দ করে এবং অভিভাবকরা এতে খুশি হবেন। আনিসুজ্জামান মনে করেন, এ ধরনের খামখেয়ালি বাজেট প্রণয়ন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর দখলদারিত্ব অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এ ছাড়া নাগরিক ও সরকারের মধ্যে আস্থার চরম সংকট এবং নাগরিক সমাজের বিভক্তিকে তিনি উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
আলোচনার এক পর্যায়ে তাঁর কাছে প্রশ্ন ছিল– কেন অন্তর্বর্তী সরকার মেয়াদের শেষ মুহূর্তে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর উত্তরে ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এটি করা বা না করা উভয় ক্ষেত্রেই সরকারের সামনে বড় ঝুঁকি ছিল। তিনি একে একটি ‘ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। ট্রাম্প (যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট) জানতেন, ‘আমরা ফাঁদে পড়েছি। এ অঞ্চলের মধ্যে ভিয়েতনাম চুক্তি করেছে, মালয়েশিয়া করেছে, ইন্দোনেশিয়া করতে যাচ্ছে। এমন একটা পর্যায়ে তারা চুক্তি করতে বললে, চাইলেই কী তা উপেক্ষা করা যায়? আমাদের বড় বাজার (তৈরি পোশাক) সেখানে।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি হয়তো এমন চুক্তির বিরোধিতা করতে পারেন, কিন্তু যখন কেউ সরকারে থেকে নীতিনির্ধারণ করেন, তখন তাঁকে অনেক সময় আদর্শের চেয়ে বাস্তবতাকে বেশি প্রাধান্য দিতে হয়। তাঁর মতে, ওই সময়ে এমন সিদ্ধান্ত না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার বলেন, ১৯৯১ সালে বাজারভিত্তিক অর্থনীতির দিকে যাত্রা শুরু হয়। তবে গত তিন দশকে অনেক প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি।
এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি. রহমান বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের শর্তগুলো মূলত সুশাসন ও সংস্কারকেন্দ্রিক এবং এগুলো বাংলাদেশের নিজের উন্নয়নের জন্যই প্রয়োজন।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের এই সময়ে বাংলাদেশকে এখন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে। তিনি প্রকৃত নীতি স্বাধীনতার জন্য দেশীয় স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবমুক্ত থাকার ওপর জোর দেন। গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, উন্নয়ন সহযোগীরা এখন স্থানীয় প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করছে। তবে সফল হতে হলে বাংলাদেশের নিজস্ব দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বিজিএমইএর সহসভাপতি রেজওয়ান সেলিম শিক্ষার মান উন্নয়ন ও মেধা পাচার রোধের তাগিদ দেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম বলেন, উচ্চ সুদের অভ্যন্তরীণ ঋণ দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
আপনার মোবাইল দিয়ে এই QR কোডটি স্ক্যান করে বিস্তারিত খবরটি অনলাইনে পড়ুন।
https://www.vtvbd.com/business/2026/08/03/newsID_424/© VTV BD | Bangla News | Latest News | প্রিন্ট/ডাউনলোড: ০৩-০৮-২০২৬, ০৯:৪৮ অপরাহ্ণ