VTV BD | Bangla News | Latest News
প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ

১০ দিনে প্রায় ১০ হাজার অভিযোগ

মায়ের পেনশনের টাকা তুলতে ঘুষের অভিজ্ঞতা, সেখান থেকেই ঘুষ.সাইট

লেখক: ভিটিভি বিডি ডেক্স

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায়, কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে—সাধারণ মানুষের এমন অভিজ্ঞতা এক জায়গায় নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন দুই তরুণ। তাদের তৈরি ‘ঘুষ.সাইট’ চালুর মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ৩১ আগস্ট সকাল ১০টা পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মটিতে ৯ হাজার ৯২৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের সম্মিলিত পরিমাণ প্রায় ৩৩৪ কোটি টাকা। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব তথ্য ব্যবহারকারীদের দেওয়া অযাচাইকৃত অভিযোগ; এগুলোকে প্রমাণিত ঘুষের পরিমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

 

যেভাবে শুরু হলো ঘুষ.সাইট

এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন দুই বন্ধু শাহেদ শরীফ আহমেদ ও সাইফ কবীর। তাঁদের একজন শাহেদ বর্তমানে এ-লেভেলে পড়াশোনা করছেন। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নিজের পরিবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির চিন্তা আসে তাঁর মাথায়।

শাহেদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মায়ের পেনশনের টাকা পেতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা হয়েছিল। নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। এই ক্ষোভ থেকেই ঘুষের অভিযোগগুলো এক জায়গায় তুলে ধরার চিন্তা করেন।

ভারতে এ ধরনের একটি উদ্যোগ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে শাহেদ মাত্র দুই ঘণ্টায় ওয়েবসাইটটির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেন। পরে বন্ধু সাইফ কবীরের সহযোগিতায় ডোমেইন কেনা হয় এবং গত ২১ আগস্ট চালু হয় ‘ঘুষ.সাইট’। পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাঁদের প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

 

কীভাবে কাজ করে সাইটটি?

‘ঘুষ.সাইট’-এ অভিযোগ জানাতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন নেই। ব্যবহারকারীকে মূলত জানাতে হয়—

কোন সরকারি দপ্তরে ঘটনা ঘটেছে
কী ধরনের সেবা নিতে গিয়েছিলেন
ঘটনাটি কোন এলাকায় ঘটেছে
কত টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল
শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল

এর সঙ্গে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণও দেওয়া যায়। তবে কোনো ব্যক্তির নাম, পদবি বা ফোন নম্বর প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়নি।

সাইটটির দাবি, পরিচয় গোপন রাখাই তাদের অন্যতম প্রধান নীতি। কোনো অ্যাকাউন্ট, নাম, ই-মেইল বা ফোন নম্বর চাওয়া হয় না। জমা দেওয়া রিপোর্ট প্রকাশের আগে মডারেশনের মধ্য দিয়ে যায়।

 

মাত্র কয়েক দিনেই হাজার হাজার অভিযোগ

চালুর পর থেকেই দ্রুত বাড়তে থাকে অভিযোগের সংখ্যা। প্রথম দুই দিনেই জমা পড়ে ৮০৪টি অভিযোগ, যেখানে দাবিকৃত ঘুষের পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। তিন দিনে অভিযোগ দাঁড়ায় ২ হাজার ৭০৯টিতে এবং দাবিকৃত অর্থ ৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

 

চার দিন পর অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩৬১টি, আর এসব অভিযোগে দাবিকৃত ঘুষের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

এরপর আরও দ্রুত বাড়তে থাকে প্ল্যাটফর্মটির ব্যবহার। ৩১ আগস্ট সকাল ১০টার হিসাব অনুযায়ী অভিযোগের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছেছে এবং দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৩৪ কোটি টাকা।

 

 

কোন বিভাগে অভিযোগ বেশি?

প্রথম দিকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগ থেকেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে। প্রথম চার দিনের হিসাবেও ঢাকার অভিযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি—১ হাজার ৯৪২টি। এরপর ছিল চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে অভিযোগ ছিল ১ হাজারের বেশি।

তবে এই সংখ্যাগুলোকে কোনো বিভাগের প্রকৃত দুর্নীতির চূড়ান্ত চিত্র বলা যাবে না। কারণ এগুলো নির্ভর করছে মানুষ কোথা থেকে কত বেশি রিপোর্ট করছেন তার ওপর।

 

 

৩৩৪ কোটি টাকা কি সত্যিই ঘুষ নেওয়া হয়েছে?

এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

৩৩৪ কোটি টাকা কোনো সরকারি তদন্তে প্রমাণিত ঘুষের পরিমাণ নয়। এটি ওয়েবসাইটে জমা দেওয়া অভিযোগে ব্যবহারকারীরা যে পরিমাণ অর্থ ঘুষ হিসেবে দাবি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন, সেই অঙ্কের সম্মিলিত হিসাব। সাইট নিজেও প্রতিটি রিপোর্টকে ‘অযাচাইকৃত’ হিসেবে উল্লেখ করে।

অর্থাৎ, এই পরিসংখ্যানকে বাংলাদেশের সরকারি খাতে প্রকৃত ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। একইভাবে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা কর্মকর্তাকে দোষী বলার সুযোগও নেই।

 

তাহলে ঘুষ.সাইট এর উদ্দেশ্য কী?

উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা নয়। বরং বিভিন্ন মানুষের বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাকে এক জায়গায় এনে ঘুষ চাওয়ার সম্ভাব্য প্রবণতা বা প্যাটার্ন তুলে ধরা।

সাইটটির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো সরকারি অভিযোগ গ্রহণকারী সংস্থা কিংবা তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান নয়। বরং একটি ‘সচেতনতামূলক লেজার’—যেখানে নাগরিকদের অযাচাইকৃত অভিযোগগুলো একত্র করা হচ্ছে।

 

 

সরকার চাইলে হতে পারে বড় ডেটাবেস

এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে এর বিপুল তথ্যভাণ্ডার। কোন সেবায় কত অভিযোগ, কোন দপ্তর নিয়ে কত অভিযোগ, কোন এলাকায় ঘুষের দাবি বেশি—এ ধরনের তথ্য দীর্ঘমেয়াদে বিশ্লেষণ করা গেলে সরকারি সেবায় দুর্নীতির সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

তবে এজন্য প্রয়োজন অভিযোগের স্বাধীন যাচাই, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ। শুধু অভিযোগের সংখ্যা বাড়লেই দুর্নীতি কমবে না।

 

নিজস্ব অর্থায়নে তরুণদের উদ্যোগ

বর্তমানে ‘ঘুষ.সাইট’ উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অর্থায়ন বা সম্পৃক্ততা নেই বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। শাহেদ ও সাইফের উদ্যোগটি তাই শুধু একটি ওয়েবসাইট তৈরির ঘটনা নয়; বরং নাগরিকদের অভিজ্ঞতাকে ডিজিটালভাবে নথিবদ্ধ করার একটি নতুন প্রচেষ্টা।

 

 

শেষ কথা

মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ‘ঘুষ.সাইট’-এ প্রায় ১০ হাজার অভিযোগ জমা পড়া দেখিয়ে দিয়েছে—সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে মানুষের বলার মতো অনেক কিছু রয়েছে।

 

তবে এই প্ল্যাটফর্মের তথ্যকে সরাসরি প্রমাণিত দুর্নীতির হিসাব হিসেবে দেখা যাবে না। বরং এটি মানুষের অভিযোগ ও অভিজ্ঞতার একটি বড় নাগরিক ডেটাবেস।

এখন দেখার বিষয়, এই বিপুল তথ্য শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়েই থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে সরকারি সেবায় দুর্নীতির ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তব সংস্কার ও জবাবদিহির হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

সম্পাদক: ইশতিয়াক সওকত

নির্বাহী সম্পাদক: সৌরভ আহমেদ শুভ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: মতিঝিল, নাভানা টাওয়ার, ঢাকা ১২১৩

ফোন : 01719-197277 , 01700-001122
ই-মেইল : info@vtbbd.com, vtvbdlive@gmail.com

QR Code

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

আপনার মোবাইল দিয়ে এই QR কোডটি স্ক্যান করে বিস্তারিত খবরটি অনলাইনে পড়ুন।

https://www.vtvbd.com/national/2026/08/31/newsID_1321/

© VTV BD | Bangla News | Latest News | প্রিন্ট/ডাউনলোড: ৩১-০৮-২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ণ