সকল মেনু

সবশেষ

বিদ্যুতের সংকট নাকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা—কেন অন্ধকারে দেশ ?

ভিটিভি বিডি ডেক্স

ভিটিভি বিডি ডেক্স

আপডেট : আগস্ট ১২, ২০২৬
পড়তে: মিনিট
ফন্ট সাইজ:
0Shares

দেশজুড়ে চলছে তীব্র লোডশেডিং, ভুগছে বেশি গ্রামের মানুষ—এই সংকটকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা এবং নগর-গ্রামের বৈষম্যের একটি বড় পরীক্ষা।

বিদ্যুৎ সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বিদ্যুৎ কম থাকলে তার বোঝা কে বেশি বহন করছে? বাস্তবতা বলছে, শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকছেন। ফলে লোডশেডিং কেবল অন্ধকার তৈরি করছে না; এটি গ্রামের মানুষের শিক্ষা, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা ও দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

 

একজন শহুরে মানুষ বিদ্যুৎ না থাকলে হয়তো কিছু সময়ের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু গ্রামের একজন কৃষক সেচের পাম্প চালাতে না পারলে তার উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ছোট দোকান, ওয়ার্কশপ, মিল বা স্থানীয় কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়। অর্থাৎ এক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট সবার জন্য সমান ক্ষতি তৈরি করে না।

 

এখানেই বর্তমান লোডশেডিংকে নতুন করে দেখা দরকার।

সরকারি পাওয়ার গ্রিডের তথ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা গেছে। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে গ্যাস সরবরাহের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাত—দুই জায়গাতেই চাপ তৈরি করেছে।

 

তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু— কারেন্ট কখন আসবে?

প্রশ্ন হওয়া উচিত— কেন আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বারবার এমন সংকটে পড়ছে?

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু শুধু উৎপাদনক্ষমতা থাকলেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত জ্বালানি, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র, শক্তিশালী সঞ্চালনব্যবস্থা, দক্ষ বিতরণব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা। এর যেকোনো একটি জায়গায় দুর্বলতা তৈরি হলে পুরো ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লোডশেডিং ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যতা। সংকট হলে শহর ও গ্রামের মধ্যে কে কতটা বিদ্যুৎ পাবে—এ নিয়ে স্বচ্ছ নীতি থাকা প্রয়োজন। গ্রামের মানুষ যেন শুধু ‘সহনশীল’ ধরে নিয়ে বারবার তাদের এলাকাকেই বেশি লোডশেডিংয়ের আওতায় রাখা না হয়।

কারণ গ্রাম এখন আর শুধু কৃষিনির্ভর এলাকা নয়। সেখানে অনলাইনভিত্তিক কাজ হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল শিক্ষা নিচ্ছে, ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠছে, দোকান ও ব্যবসা বাড়ছে। বিদ্যুৎহীনতা তাই গ্রামের অর্থনীতিকে সরাসরি পিছিয়ে দেয়।

সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যুৎ এখন বিলাসিতা নয়—এটি অর্থনৈতিক অধিকার ও উৎপাদনের মৌলিক অবকাঠামো।

সরকারের তাই জরুরি ভিত্তিতে তিনটি বিষয়ে নজর দেওয়া দরকার। প্রথমত, স্বল্পমেয়াদে গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক করা। দ্বিতীয়ত, লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে শহর-গ্রামের মধ্যে ন্যায্য ও স্বচ্ছ বণ্টন নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কমিয়ে দেশীয় গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দক্ষ বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো।

 

কারণ আজকের লোডশেডিং যদি শুধু সাময়িক সংকট হিসেবে দেখা হয়, তাহলে আগামী বছর আবার একই প্রশ্ন ফিরে আসবে। কিন্তু যদি এটিকে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতার সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এই সংকট থেকেই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

অন্ধকারে শুধু বাতি নিভে যায় না—একটি পরিবারের আয়, একটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, একজন কৃষকের উৎপাদন এবং একটি গ্রামের অর্থনীতিও থমকে যায়। তাই লোডশেডিংয়ের সমাধান শুধু বিদ্যুৎ বাড়ানো নয়; প্রয়োজন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে আরও ন্যায্য, নির্ভরযোগ্য ও টেকসই করা।

ফন্ট সাইজ:
0Shares

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।